উৎপাদন, গুণগত মান ও শ্রমিক কল্যাণে অবদানের জন্য সম্মাননা
কমলগঞ্জ (মৌলভীবাজার) প্রতিনিধিঃ
একদিকে সবুজ চা বাগানের বিস্তৃতি, অন্যদিকে হাজারো শ্রমিকের ঘাম ও পরিশ্রম। সেই শ্রম, উদ্ভাবন ও সাফল্যের গল্পগুলোই এবার উঠে এলো জাতীয় চা দিবস-২০২৬-এর মঞ্চে। দেশের চা শিল্পে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে শীর্ষ চা বাগান, প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিদের সম্মাননা প্রদান করা হয়েছে।
শনিবার (২০ জুন) শ্রীমঙ্গলের অডিটোরিয়াম কাম মাল্টিপারপাস হলে অনুষ্ঠিত ৬ষ্ঠ জাতীয় চা দিবসের অনুষ্ঠানে এসব পুরস্কার ঘোষণা করা হয়। অনুষ্ঠানে দেশের চা শিল্পের উন্নয়ন, শ্রমিক কল্যাণ এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের চায়ের সম্ভাবনা নিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেন বক্তারা।
এবার একরপ্রতি সর্বোচ্চ উৎপাদনকারী চা বাগানের স্বীকৃতি পেয়েছে মৌলভীবাজারের শ্রী গোবিন্দপুর চা বাগান। সর্বোচ্চ গুণগতমানসম্পন্ন চা উৎপাদনকারী বাগান হিসেবে নির্বাচিত হয়েছে মধুপুর চা বাগান। শ্রেষ্ঠ চা রপ্তানিকারকের সম্মাননা পেয়েছে দি কনসোলিডেটেড টি অ্যান্ড ল্যান্ডস কোম্পানি (বাংলাদেশ) লিমিটেড।
ক্ষুদ্র চা চাষে সাফল্যের জন্য পঞ্চগড়ের আটোয়ারী উপজেলার সোনাপাতিলা গ্রামের চাষি মো. মতিয়ার রহমান শ্রেষ্ঠ ক্ষুদ্রায়তন চা উৎপাদনকারীর পুরস্কার অর্জন করেন। শ্রমিক কল্যাণে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতি পেয়েছে মির্জাপুর চা বাগান।
চা পণ্যের উদ্ভাবনী বাজারজাতকরণ এবং পুষ্টিসমৃদ্ধ চা মিশ্রণ বাজারজাতকরণের জন্য দুটি পৃথক ক্যাটাগরিতে পুরস্কৃত হয়েছে কাজী অ্যান্ড কাজী টি এস্টেট লিমিটেড। এছাড়া নেপুচা চা বাগানের শ্রমিক জেসমিন ওরাওঁ শ্রেষ্ঠ চা-পাতা চয়নকারী হিসেবে সম্মাননা লাভ করেন। জাতীয় চা দিবসের বিশেষ পুরস্কার পেয়েছে পঞ্চগড়ের সৃষ্টি টি লিমিটেড, যা দেশের শ্রেষ্ঠ বটলিং চা কারখানা হিসেবে নির্বাচিত হয়েছে।
অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন স্থানীয় সংসদ সদস্য মো. মুজিবুর রহমান চৌধুরী। উদ্বোধনী বক্তব্যে তিনি বলেন, “চা শুধু একটি পানীয় নয়, এটি বাংলাদেশের অর্থনীতি, ঐতিহ্য ও লাখো মানুষের জীবিকার অংশ। এই শিল্পকে আরও আধুনিক ও আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে হবে।”
তিনি চা শ্রমিকদের অবদানের কথা উল্লেখ করে বলেন, তাদের ন্যায্য মজুরি, আবাসন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা সময়ের দাবি। একই সঙ্গে শ্রীমঙ্গলকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক মানের ‘চা পর্যটন’ গড়ে তোলার সম্ভাবনার কথাও তুলে ধরেন তিনি।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আতাউর রহমান খান। তিনি বলেন, চা শিল্পের টেকসই উন্নয়ন এবং শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এ জন্য সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
স্বাগত বক্তব্যে বাংলাদেশ চা বোর্ডের চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল মো. মেসবাহ উদ্দিন আহমেদ জানান, চা শিল্পের আধুনিকায়নে বাংলাদেশ চা বোর্ডের কার্যক্রম ডিজিটাল করা হয়েছে। পাশাপাশি তথ্যভাণ্ডার সমৃদ্ধ করতে চালু করা হয়েছে ‘বাংলাদেশ টি ইন্ডাস্ট্রি’ ও ‘দুটি পাতা একটি কুঁড়ি’ নামের দুটি মোবাইল অ্যাপ।
তিনি বলেন, উন্নত জাতের ক্লোন চা উৎপাদন বৃদ্ধিতে ইতোমধ্যে ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে। পাশাপাশি জেসমিন টি, রোজ টি, লেমন টি, মাসালা টি ও চকোলেট টি-সহ বিভিন্ন ভ্যালু অ্যাডেড চা উৎপাদনের মাধ্যমে রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
অনুষ্ঠানে চা খাতের বিভিন্ন সংগঠনের নেতৃবৃন্দ বক্তব্য দেন। পরে অতিথিরা জাতীয় চা দিবস উপলক্ষে আয়োজিত চা মেলার বিভিন্ন স্টল পরিদর্শন করেন।
সংশ্লিষ্টদের মতে, এ ধরনের স্বীকৃতি শুধু পুরস্কারপ্রাপ্তদের উৎসাহিত করবে না; বরং দেশের চা শিল্পে উৎপাদন, গুণগত মান, উদ্ভাবন ও শ্রমিক কল্যাণে ইতিবাচক প্রতিযোগিতা সৃষ্টি করবে। এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের চায়ের অবস্থান আরও শক্তিশালী হবে বলে তারা আশা প্রকাশ করেন।