কমলগঞ্জ (মৌলভীবাজার) প্রতিনিধিঃ
বিশ্ব সাপ দিবস উপলক্ষে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলায় লোকালয় থেকে একটি অজগর সাপ উদ্ধার করে কমলগঞ্জ উপজেলার লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে অবমুক্ত করেছে বন বিভাগ। বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) সকাল সাড়ে ১১টার দিকে উপজেলার উত্তর ভাড়াউড়া এলাকার যোবায়ের আহমেদের বাড়ি থেকে সাপটি উদ্ধার করা হয়। পরে প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শেষে বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের তত্ত্বাবধানে কমলগঞ্জের লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে অবমুক্ত করা হয়।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত কয়েকদিন ধরে যোবায়ের আহমেদের বাড়ি থেকে হাঁস ও মুরগির কয়েকটি বাচ্চা রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হচ্ছিল। বিষয়টি নিয়ে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দেয়। বৃহস্পতিবার সকালে বাড়ির দেয়ালের ওপর একটি বড় আকৃতির অজগর সাপ দেখতে পান তারা। পরে সাপটিকে পাশের একটি গাছের দিকে যেতে দেখলে ধারণা করা হয়, নিখোঁজ হওয়া হাঁস-মুরগির বাচ্চাগুলো ওই অজগরটিই খেয়েছে।
খবর পেয়ে বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনের পরিচালক স্বপন দেব সজল, পরিবেশকর্মী রাজদীপ দেব ও রিদন গৌড় দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছান। দীর্ঘ সময়ের সতর্ক অভিযানের মাধ্যমে তারা অজগর সাপটিকে অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করতে সক্ষম হন। উদ্ধার অভিযানে স্থানীয় বাসিন্দারাও সহযোগিতা করেন।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা ও দেশের খ্যাতিমান বন্যপ্রাণী সংরক্ষণকর্মী সীতেশ রঞ্জন দেব (সীতেশ বাবু) গত ১৪ জুলাই মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যুর মাত্র দুই দিন পরই বিশ্ব সাপ দিবসে ফাউন্ডেশনের পরিচালক স্বপন দেব সজল ও সহকর্মীদের এই উদ্ধার অভিযান বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ কার্যক্রমের ধারাবাহিকতারই প্রমাণ বলে মনে করছেন প্রকৃতিপ্রেমীরা। সীতেশ বাবুর দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টায় গড়ে ওঠা প্রতিষ্ঠানটি এখনও আহত ও বিপন্ন বন্যপ্রাণী উদ্ধারে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে।
উদ্ধারের পর সাপটিকে নিরাপদে সংরক্ষণ করে শ্রীমঙ্গলে বন্যপ্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের রেঞ্জ কার্যালয়ে হস্তান্তর করা হয়। পরবর্তীতে বন বিভাগের কর্মকর্তারা সাপটির শারীরিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে প্রাকৃতিক আবাসস্থলে ফিরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের মৌলভীবাজার রেঞ্জ কর্মকর্তা কাজী নাজমুল হক জানান, উদ্ধার হওয়া অজগরটি সুস্থ থাকায় সেটিকে কমলগঞ্জ উপজেলার লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে অবমুক্ত করা হয়েছে। লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এলাকা হওয়ায় সেখানে সাপটির স্বাভাবিকভাবে বেঁচে থাকার সুযোগ রয়েছে।
তিনি বলেন, “অজগর সাপ বিষধর নয়। এটি পরিবেশের খাদ্যশৃঙ্খল ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অনেক সময় মানুষ ভয় বা ভুল ধারণার কারণে সাপ দেখলেই হত্যা করে, যা পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। লোকালয়ে সাপ বা অন্য কোনো বন্যপ্রাণী দেখা গেলে আতঙ্কিত না হয়ে বন বিভাগ অথবা বন্যপ্রাণী উদ্ধারকারী সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ করা উচিত।”
বিশ্ব সাপ দিবসে এমন একটি উদ্ধার অভিযান বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের গুরুত্বকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বনাঞ্চল সংকুচিত হওয়া, আবাসস্থল ধ্বংস এবং খাদ্যের সন্ধানে অনেক সময় বন্যপ্রাণী লোকালয়ে চলে আসে। শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জের বিস্তীর্ণ বনাঞ্চল সংলগ্ন এলাকায় এ ধরনের ঘটনা মাঝেমধ্যেই দেখা যায়।
প্রকৃতিপ্রেমীরা মনে করেন, কমলগঞ্জের লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান এবং আশপাশের সংরক্ষিত বনাঞ্চল দেশের গুরুত্বপূর্ণ বন্যপ্রাণীর নিরাপদ আবাসস্থল। উদ্ধার হওয়া প্রাণীগুলোকে যথাযথভাবে পুনর্বাসন ও অবমুক্ত করার মাধ্যমে বন বিভাগের পাশাপাশি স্থানীয় পরিবেশকর্মীরাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন।
বিশ্ব সাপ দিবসে উদ্ধার হওয়া অজগরটির নিরাপদে প্রাকৃতিক পরিবেশে ফিরে যাওয়া বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে একটি ইতিবাচক বার্তা বহন করছে। একই সঙ্গে এটি প্রয়াত সীতেশ রঞ্জন দেবের দীর্ঘদিনের বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আন্দোলনের ধারাবাহিকতাও স্মরণ করিয়ে দেয়।