কমলপত্র ডেস্ক রিপোর্টঃ
বাংলাদেশের পর্যটন মানচিত্রে কক্সবাজার, সাজেক, বান্দরবান কিংবা সেন্টমার্টিনের নাম যতটা উচ্চারিত হয়, মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ ততটা আলোচনায় আসে না। অথচ প্রকৃতি, ইতিহাস, জীববৈচিত্র্য, চা-বাগান, ঝরনা, হ্রদ, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সংস্কৃতি ও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিকে একসঙ্গে ধারণ করে থাকা এই জনপদ নিঃসন্দেহে দেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় পর্যটন অঞ্চল। সরকারি তালিকায় কমলগঞ্জে আটটি প্রধান পর্যটন স্পটের উল্লেখ থাকলেও স্থানীয়ভাবে পরিচিত দর্শনীয় স্থান, সংস্কৃতিকেন্দ্র, খাসিয়া পুঞ্জি, চা-বাগান ও ঐতিহাসিক নিদর্শন মিলিয়ে পর্যটকদের জন্য আকর্ষণীয় স্থানের সংখ্যা ১৫টিরও বেশি।
চা-বাগান, পাহাড়ি টিলা, সংরক্ষিত বনাঞ্চল ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ঘেরা কমলগঞ্জকে অনেকেই বাংলাদেশের অন্যতম বৈচিত্র্যময় পর্যটন জনপদ হিসেবে বিবেচনা করেন। প্রকৃতিপ্রেমী, গবেষক, ফটোগ্রাফার, শিক্ষার্থী এবং অ্যাডভেঞ্চারপ্রেমীদের কাছে দীর্ঘদিন ধরেই এটি একটি আকর্ষণীয় গন্তব্য। দেশের অন্যতম বৃহৎ চা উৎপাদন অঞ্চল হিসেবে পরিচিত এ উপজেলায় একই সঙ্গে প্রকৃতি, ইতিহাস ও সংস্কৃতির সমন্বয় ঘটেছে।
কমলগঞ্জের পর্যটনের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে সবচেয়ে বেশি পরিচিত লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান। দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংরক্ষিত বনাঞ্চল হিসেবে পরিচিত এই উদ্যান জীববৈচিত্র্যের এক বিশাল ভাণ্ডার। বিরল উল্লুক, বিভিন্ন প্রজাতির পাখি, বন্যপ্রাণী এবং শত শত প্রজাতির উদ্ভিদে সমৃদ্ধ এ বনাঞ্চল প্রতিবছর হাজারো পর্যটককে আকর্ষণ করে। বনভূমির ভেতর দিয়ে চলে যাওয়া ঐতিহাসিক রেললাইন এবং ছায়াঘেরা ট্রেইল ভ্রমণকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলে।
প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যের আরেক অনন্য নিদর্শন মাধবপুর লেক। পাত্রখলা চা-বাগানের মাঝখানে অবস্থিত এই লেককে অনেকেই কমলগঞ্জের সৌন্দর্যের প্রতীক বলে মনে করেন। সবুজ পাহাড়, চা-বাগান, জলরাশি ও পাখির কলতানে মুখরিত এ লেক দেশি-বিদেশি পর্যটকদের কাছে দীর্ঘদিন ধরেই জনপ্রিয়। বর্ষাকালে এর সৌন্দর্য আরও মোহনীয় হয়ে ওঠে।
অ্যাডভেঞ্চারপ্রেমীদের কাছে কমলগঞ্জের সবচেয়ে আলোচিত নাম হামহাম জলপ্রপাত। রাজকান্দি সংরক্ষিত বনাঞ্চলের গভীরে অবস্থিত এই জলপ্রপাত দেখতে পর্যটকদের দীর্ঘ পাহাড়ি পথ পাড়ি দিতে হয়। দুর্গম পথের রোমাঞ্চ আর পাহাড়ের বুক চিরে নেমে আসা জলধারা হামহামকে দেশের অন্যতম আকর্ষণীয় ট্রেকিং গন্তব্যে পরিণত করেছে।
কমলগঞ্জের পর্যটন শুধু প্রকৃতিনির্ভর নয়, ইতিহাসও এখানে সমানভাবে সমৃদ্ধ। মহান মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য বীরত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ বীরশ্রেষ্ঠ উপাধিপ্রাপ্ত শহীদ সিপাহী হামিদুর রহমানের স্মৃতিসৌধ আজ দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক দর্শনীয় স্থান। প্রতিবছর অসংখ্য মানুষ এখানে এসে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন এবং স্বাধীনতা যুদ্ধের গৌরবময় ইতিহাস সম্পর্কে জানার সুযোগ পান।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের স্মৃতি বহনকারী শমসেরনগর বিমানবন্দরও কমলগঞ্জের গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোর একটি। একসময় এটি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার উল্লেখযোগ্য সামরিক বিমানঘাঁটিগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল। আজও এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব পর্যটকদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে আছে।
সরকারি তালিকায় থাকা ক্যামেলিয়া লেক, প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমণ্ডিত চা-বাগান এবং ললিতকলা একাডেমির পাশাপাশি রাজকান্দি সংরক্ষিত বন, বিভিন্ন খাসিয়া পুঞ্জি, মণিপুরী পাড়া, মণিপুরী সংস্কৃতিকেন্দ্র, কালেঞ্জী পান পুঞ্জি, মাগুরছড়া এলাকা এবং চা-বাগানঘেরা পাহাড়ি জনপদগুলো কমলগঞ্জের পর্যটন বৈচিত্র্যকে আরও সমৃদ্ধ করেছে। স্থানীয় সংস্কৃতি, জীবনযাপন, হস্তশিল্প ও ঐতিহ্যের কারণে এসব স্থান পর্যটকদের কাছে ভিন্নধর্মী অভিজ্ঞতা এনে দেয়।
স্থানীয় ব্যবসায়ী সোলাইমান উদ্দিন ও সেলিম আহমেদ বলেন, “পর্যটক বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্যও প্রসারিত হচ্ছে। হোটেল, রেস্তোরাঁ, পরিবহন ও ক্ষুদ্র ব্যবসার সঙ্গে জড়িত অনেক মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। পরিকল্পিতভাবে পর্যটন খাতকে এগিয়ে নেওয়া গেলে কমলগঞ্জের অর্থনীতিতে আরও বড় পরিবর্তন আসবে।”
বাংলাদেশ পাহাড় রক্ষা উন্নয়ন সোসাইটি কমলগঞ্জ উপজেলা কমিটির উপদেষ্টা মুঈদ আসিক চিশতি বলেন, “কমলগঞ্জের পাহাড়, বনাঞ্চল ও প্রাকৃতিক সম্পদ শুধু পর্যটনের সম্পদ নয়, এগুলো পরিবেশেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। পর্যটন উন্নয়নের পাশাপাশি পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার বিষয়টিকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। টেকসই পর্যটন ব্যবস্থাপনা ছাড়া দীর্ঘমেয়াদে এই সম্ভাবনা ধরে রাখা সম্ভব হবে না।”
কমলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সন্দ্বীপ তালুকদার বলেন, “প্রকৃতি, ইতিহাস ও সংস্কৃতির সমন্বয়ে কমলগঞ্জ একটি অনন্য পর্যটন সম্ভাবনাময় উপজেলা। পর্যটকদের জন্য নিরাপদ ও আকর্ষণীয় পরিবেশ নিশ্চিত করতে উপজেলা প্রশাসন বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়ে কাজ করছে। পর্যটন খাতের উন্নয়ন স্থানীয় অর্থনীতিকেও আরও গতিশীল করবে বলে আমরা আশাবাদী।”
কমলগঞ্জ-শ্রীমঙ্গল-মৌলভীবাজার-৪ আসনের সংসদ সদস্য আলহাজ্ব মো. মুজিবুর রহমান চৌধুরী (হাজী মুজিব) বলেন, “মৌলভীবাজার জেলার পর্যটন খাতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হচ্ছে কমলগঞ্জ। লাউয়াছড়া, মাধবপুর লেক, হামহাম জলপ্রপাত, বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান স্মৃতিসৌধসহ বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানকে কেন্দ্র করে পর্যটনের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে পর্যটনবান্ধব অবকাঠামো গড়ে তোলার চেষ্টা চলছে। ভবিষ্যতে এ খাতের আরও উন্নয়নে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।”
সংশ্লিষ্টদের মতে, হামহাম ও রাজকান্দি এলাকায় পর্যটকবান্ধব অবকাঠামো উন্নয়ন, দর্শনীয় স্থানগুলোতে মানসম্মত সাইনবোর্ড স্থাপন, তথ্যকেন্দ্র নির্মাণ, নিরাপত্তা জোরদার এবং পরিবেশ সংরক্ষণে আরও কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন। একই সঙ্গে লাউয়াছড়া, মাধবপুর লেক, হামহাম, শমসেরনগর, বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান স্মৃতিসৌধ, খাসিয়া পুঞ্জি ও মণিপুরী সংস্কৃতিকে একত্রে ব্র্যান্ডিং করে একটি সমন্বিত পর্যটন সার্কিট গড়ে তোলারও দাবি উঠেছে।
প্রকৃতির উদারতা, ইতিহাসের গৌরব, সংস্কৃতির বৈচিত্র্য এবং পর্যটনের অপার সম্ভাবনা—সব মিলিয়ে কমলগঞ্জ নিঃসন্দেহে এমন একটি জনপদ, যা ভবিষ্যতে দেশের পর্যটন খাতে নতুন পরিচয়ের জন্ম দিতে পারে। পরিকল্পিত উন্নয়ন, কার্যকর প্রচারণা এবং পরিবেশবান্ধব ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে একদিন হয়তো কমলগঞ্জ পরিচিত হবে বাংলাদেশের ‘পর্যটনের অঘোষিত রাজধানী’ হিসেবে।