কমলগঞ্জ (মৌলভীবাজার) প্রতিনিধি:
গাছের ছায়ায় মানুষ স্বস্তি খোঁজে, গাছের অক্সিজেনে বেঁচে থাকে প্রাণ। অথচ সেই গাছের বুকেই পেরেক ঠুকে নিজেদের প্রচারণার ঠিকানা তৈরি করছেন বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান। মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জে সড়কের পাশের গাছগুলোতে নির্বিচারে সাইনবোর্ড, ব্যানার, ফেস্টুন ও বিজ্ঞাপন টাঙানোর এমন চিত্র এখন উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাণিজ্যিক প্রচারণা থেকে শুরু করে চিকিৎসাসেবা, কোচিং সেন্টার, বাড়িভাড়া, শুভেচ্ছা বার্তা এবং আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে সম্ভাব্য প্রার্থীদের প্রচারণামূলক সাইনবোর্ডেও ছেয়ে গেছে গাছের গুঁড়ি ও ডালপালা।
উপজেলার বিভিন্ন সড়ক ঘুরে দেখা যায়, গাছের গায়ে লোহার পেরেক ও তারকাঁটা ঠুকে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে ছোট-বড় নানা ধরনের বিজ্ঞাপন। কমলগঞ্জ পৌর এলাকা, মুন্সিবাজার, শমশেরনগর ও আদমপুরসহ বিভিন্ন এলাকার সড়কের পাশের গাছগুলোতে এমন দৃশ্য চোখে পড়ে। কোথাও একটি গাছে একাধিক সাইনবোর্ড, কোথাও আবার গাছের গুঁড়ি ঘিরে রয়েছে প্রচারণার নানা উপকরণ। যেন গাছগুলো পরিণত হয়েছে বিনা খরচের বিজ্ঞাপন প্রদর্শনীর স্থানে।
নববর্ষ, স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে শুভেচ্ছা সাইনবোর্ডের পাশাপাশি বিভিন্ন সময় রাজনৈতিক প্রচারণার উপকরণও যুক্ত হচ্ছে গাছে। নতুন চিকিৎসক, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও কোচিং সেন্টারের পরিচিতি বাড়ানোর লক্ষ্যেও ব্যবহৃত হচ্ছে এসব গাছ। এমনকি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সামনের গাছেও বিভিন্ন চিকিৎসাসেবা ও বিশেষায়িত চিকিৎসার বিজ্ঞাপন ঝুলতে দেখা যায়। এতে গাছের ক্ষতির পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের উপযোগী পরিবেশ নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
প্রচারণার আড়ালে গাছের ক্ষতি
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, কমলগঞ্জে গাছে সাইনবোর্ড লাগানোর প্রবণতা একেবারে নতুন নয়; প্রায় এক থেকে দেড় দশক ধরে এর বিস্তার ঘটেছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও রাজনৈতিক প্রচারণার কারণে গাছের গায়ে বিজ্ঞাপনের সংখ্যা বেড়েছে বলে তাঁদের পর্যবেক্ষণ।
পরিবেশসচেতন ব্যক্তিরা বলছেন, প্রচারণার সহজ ও কম খরচের মাধ্যম হিসেবে গাছকে বেছে নেওয়া হলেও এর দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি উপেক্ষা করা হচ্ছে। গাছের গায়ে পেরেক ঠুকলে বাকল ও ভেতরের জীবন্ত টিস্যু ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ক্ষতস্থান দিয়ে ছত্রাক ও অন্যান্য রোগজীবাণু প্রবেশের সুযোগ তৈরি হতে পারে। এতে গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হওয়া থেকে শুরু করে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির আশঙ্কা থাকে। পেরেকের সঙ্গে বাঁধা তার বা অন্য উপকরণ গাছের বৃদ্ধি ব্যাহত করতে পারে এবং সময়ের সঙ্গে গাছের গায়ে ক্ষত সৃষ্টি করতে পারে।
সেভ ওয়াইল্ড লাইফ অ্যান্ড ন্যাচার, মৌলভীবাজার ইউনিটের সভাপতি মো. আহাদ মিয়া, পরিবেশকর্মী নুরুল মোহাইমিন মিল্টন, সাংবাদিক ও সংস্কৃতিকর্মী নির্মল এস পলাশ এবং সাংবাদিক সাইদুল ইসলামের সঙ্গে আলাপচারিতায় গাছের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের বিষয়টি উঠে আসে। তাঁদের মতে, গাছের গায়ে পেরেক ঠুকে বিজ্ঞাপন লাগানো বন্ধে ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্বশীল আচরণ জরুরি। গাছকে কেবল প্রচারণার জায়গা হিসেবে দেখলে চলবে না; পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় গাছের ভূমিকা বিবেচনায় নিতে হবে।
সবুজ রক্ষায় বিকল্প প্রচারণার আহ্বান
লেখক, গবেষক ও কবি আব্দুস সামাদ বলেন, “আমাদের প্রাণের রসদদাতা এই সবুজ, সতেজ গাছগুলোই আমাদের বেঁচে থাকার অন্যতম অবলম্বন। গাছ আমাদের অক্সিজেন দেয়, পরিবেশকে শীতল রাখে এবং প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষা করে। তাই বিজ্ঞাপন প্রচারের নামে এসব সবুজ গাছের ক্ষতিসাধন কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।”
তিনি বিজ্ঞাপন প্রচারে গাছের ক্ষতি হয় না—এমন বিকল্প পদ্ধতি ব্যবহারের আহ্বান জানান। তাঁর মতে, গাছ রক্ষায় সচেতনতা বাড়ানো গেলে আগামী প্রজন্মের জন্য সবুজ ও বাসযোগ্য পরিবেশ নিশ্চিত করা সহজ হবে।
কমলগঞ্জ প্রেসক্লাবের সভাপতি আসহাবুজ্জামান মনে করেন, গাছে পেরেক ঠুকে সাইনবোর্ড লাগানোর ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে জনসচেতনতা তৈরিতে উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। শুধু নিষেধাজ্ঞা নয়, ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে গাছের ক্ষতি না করে কীভাবে প্রচারণা চালানো যায়, সে বিষয়েও সচেতন করতে হবে।
কমলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সন্দ্বীপ তালুকদার বলেন, গাছে পেরেক ঠুকে সাইনবোর্ড লাগালে গাছে পচন ধরতে পারে এবং ধীরে ধীরে গাছ মারা যেতে পারে। এতে পরিবেশের ভারসাম্যও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। গাছের ক্ষতি করা দণ্ডনীয় অপরাধ উল্লেখ করে তিনি জানান, পুরো উপজেলায় এ বিষয়ে জনসচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন করা যেতে পারে।
প্রশ্ন উঠছে দায়িত্বশীলতা নিয়ে
প্রচার-প্রচারণা ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান কিংবা সম্ভাব্য জনপ্রতিনিধিদের পরিচিতি বাড়ানোর একটি মাধ্যম। কিন্তু সেই প্রচারণার খরচ যখন প্রকৃতিকে বহন করতে হয়, তখন তা পরিবেশের জন্য উদ্বেগজনক হয়ে ওঠে। গাছের গায়ে পেরেক ঠুকে বিজ্ঞাপন লাগানোর পরিবর্তে নির্ধারিত বিজ্ঞাপন বোর্ড, অনুমোদিত প্রচারস্থল কিংবা ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করা যেতে পারে।
কমলগঞ্জের সড়কপাশের গাছগুলোকে বিজ্ঞাপনের বোর্ডে পরিণত করার এই প্রবণতা বন্ধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর পদক্ষেপ, নিয়মিত তদারকি এবং জনসচেতনতা প্রয়োজন। একই সঙ্গে রাজনৈতিক ব্যক্তি, ব্যবসায়ী, চিকিৎসক ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানেরও দায়িত্বশীল ভূমিকা জরুরি।
কারণ, একটি সাইনবোর্ডের প্রচারণা হয়তো সাময়িক; কিন্তু একটি গাছের উপকারিতা বহু বছর ধরে মানুষ ও প্রকৃতিকে বাঁচিয়ে রাখে। তাই প্রচারণার প্রয়োজনে গাছের ক্ষতি নয়, বরং গাছ বাঁচানোর মধ্য দিয়েই দায়িত্বশীলতার পরিচয় দেওয়া হোক।