মণিপুরিদের আত্মা, প্রকৃতি আর প্রার্থনার মিলনমেলা‘লাই হারাওবা’য় তিন দিনের এক অন্য জগত

প্রকৃতি, আধ্যাত্মিকতা আর মানুষের গভীর বিশ্বাস-এই তিনের এক অপূর্ব মেলবন্ধনের নাম ‘লাই হারাওবা’। মণিপুরি মৈতৈ সম্প্রদায়ের হাজার বছরের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য বহন করা এই উৎসব যেন শুধু একটি আয়োজন নয়, বরং জীবন্ত ইতিহাসের চলমান প্রতিচ্ছবি। মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার তেতইগাঁওয়ের মণিপুরি সাংস্কৃতিক কমপ্লেক্স প্রাঙ্গণে তিন দিনব্যাপী এই উৎসব শেষ হয়েছে এক আবেগঘন ও স্নিগ্ধ পরিবেশে।
বৈশাখের গরম দুপুর পেরিয়ে বিকেলের মৃদু বাতাস যখন গাছের ডালপালায় দোলা দেয়, তখনই যেন প্রাণ ফিরে পায় উৎসব প্রাঙ্গণ। গ্রামীণ পথ ধরে দলে দলে মানুষ এসে জড়ো হতে থাকেন-কেউ পরিবার নিয়ে, কেউ বন্ধুবান্ধব নিয়ে, আবার কেউ কেবল সংস্কৃতির টানে। সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে পুরো এলাকা রঙিন জনসমুদ্রে পরিণত হয়।
উৎসবের অন্যতম আকর্ষণ ছিল অংশগ্রহণকারীদের বর্ণিল উপস্থিতি। কিশোরী ও তরুণীদের খোঁপায় ময়ূরের পেখম, ঐতিহ্যবাহী পোশাকে সজ্জিত নারী-পুরুষ, আর শিশুদের উচ্ছ্বাস-সব মিলিয়ে যেন এক চলমান শিল্পকর্ম। প্রাঙ্গণের চারপাশে বসে ছোট ছোট দোকান; খেলনা, প্রসাধনী থেকে শুরু করে পেঁয়াজু, বেগুনি, ঝালমুড়ি-সবকিছুতেই ছিল উৎসবের প্রাণচাঞ্চল্য।
শেষ দিনের বিকেল থেকেই জমে ওঠে মূল আয়োজন। শামিয়ানার নিচে দর্শকদের ভিড় বাড়তে থাকে, আর মঞ্চের পেছনে কুশীলবরা প্রস্তুত হন তাদের পরিবেশনার জন্য। ঢোল, খোল, বাঁশিসহ বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্রের সুরে ধীরে ধীরে মুখর হয়ে ওঠে পুরো প্রাঙ্গণ। সূর্য ডোবার সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয় মূল নৃত্যপর্ব -যেখানে নারী, কিশোরী ও শিশুদের অংশগ্রহণে মঞ্চ যেন জীবন্ত হয়ে ওঠে।
‘লাই হারাওবা জগোই’ এই উৎসবের প্রাণকেন্দ্র,শুধু একটি নৃত্য নয়, বরং সৃষ্টির গল্প বলার এক আদি ভাষা। মাইবি বা নারী পুরোহিতদের নেতৃত্বে এই নৃত্যের মাধ্যমে তুলে ধরা হয় সৃষ্টিতত্ত্ব, প্রকৃতি, মানবজীবনের নানা ধাপ এবং দেবতাদের প্রতি ভক্তি। সুর, তাল ও মুদ্রার সমন্বয়ে পুরো পরিবেশ এক সময় রূপ নেয় প্রার্থনার মতো পবিত্র আবহে, যেখানে দর্শকরাও যেন নীরবে সেই আধ্যাত্মিক যাত্রার অংশ হয়ে যান।
আয়োজকদের ভাষ্যমতে, ‘লাই’ অর্থ দেবতা এবং ‘হারাওবা’ মানে আনন্দ অর্থাৎ এটি দেবতাদের আনন্দোৎসব। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই উৎসব মণিপুরি জনগোষ্ঠীর ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে টিকে আছে।
স্টিয়ারিং কমিটির সদস্য রবি কিরণ সিনহা (রাজেশ) বলেন, “এটি শুধু একটি উৎসব নয়, আমাদের অস্তিত্বের অংশ। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে আমরা এই ঐতিহ্য বহন করে চলেছি।”
সদস্যসচিব ওইমান লানথই জানান, “লাই হারাওবা আমাদের সংস্কৃতির জীবন্ত প্রতিফলন, যেখানে প্রকৃতি ও মানুষের আত্মিক সম্পর্ক গভীরভাবে প্রকাশ পায়।”
আহ্বায়ক ইবুংহাল সিনহা (শ্যামল) বলেন, “মাইবিদের নৃত্য এই উৎসবের মূল আকর্ষণ, যা নতুন প্রজন্মকে তাদের শিকড়ের সঙ্গে যুক্ত রাখে।”
এই আয়োজন বাস্তবায়নে সহায়তা করেছে ইউনেসকো বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর, যা উৎসবটিকে আরও সমৃদ্ধ ও আন্তর্জাতিক গুরুত্ব দিয়েছে।
তবে নির্ধারিত প্রধান অতিথি মৌলভীবাজার-৪
(কমলগঞ্জ-শ্রীমঙ্গল) আসনের সংসদ সদস্য আলহাজ্ব মো. মুজিবুর রহমান চৌধুরী হাজি মুজিব উপস্থিত থাকতে না পারায় তাঁর পরিবর্তে জেলা বিএনপির সদস্য দুরুধ আহমেদ প্রতিনিধি হিসেবে অংশ নেন।
সবকিছু মিলিয়ে ‘লাই হারাওবা’ কেবল একটি সাংস্কৃতিক উৎসব নয়-এটি বাংলাদেশের বহুত্ববাদী সংস্কৃতির এক অনন্য উদাহরণ, যেখানে ধর্ম, প্রকৃতি ও মানুষের অন্তর্গত বিশ্বাস একসূত্রে গাঁথা। 
এই উৎসব প্রমাণ করে, আধুনিকতার ঢেউয়ের মাঝেও ঐতিহ্য তার নিজস্ব শক্তিতে টিকে থাকতে পারে,যদি থাকে মানুষের ভালোবাসা আর সম্মান।