(পৃথিবীর সকল মা’কে উৎসর্গকৃত)
লেখক | শাব্বির এলাহী
দশ মাস দশ দিন গর্ভে ধারণ করে আমায় পৃথিবীর আলো দেখিয়েছেন যিনি, আধো আধো বোলে মা ডাক শিখেছি যার কাছে, পরম মমতা আর অসীম ভালোবাসায় যিনি কোলে-কাঁখে একটু একটু করে আমায় বড় করে তুলেছেন, তিনি আমার মা। আমার সমস্ত অস্তিত্ব জুড়ে, আমার পুরো পৃথিবী জুড়ে তার সুকোমল মায়াময় অবস্থান। আমার ভাষা আর আমার মাটি দুটোই আমার মায়ের কাছ থেকে পাওয়া। তাই মায়ের পরে ভাষা ও মাটিকেও মা বলে মানি। মায়ের ভাষায় মাতৃভূমিকে সম্মান জানিয়ে গলা ছেড়ে গাই “আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি”। সুযোগ পেলেই কবিতা আওড়াই “আমার মায়ের সোনার নোলক হারিয়ে গেলো শেষে/হেথায় খুঁজি হেথায় খুঁজি সারা বাংলাদেশে”। আজও পঞ্চান্ন হাজার বর্গমাইলের সারা বাংলাদেশের প্রতিটি মায়ের মুখে আমার মায়ের মুখ দেখি। হাসি-খুশি মুখের মা’দের দেখলে যেমন উচ্ছ্বসিত হই, রোদনভরা চোখের মা’দের দেখলে কুঁকড়ে যাই কষ্টে।
পৃথিবীর সব সন্তানের কাছে তার মা জীবন ও জগতের শ্রেষ্ঠ সম্পদ। তবু আমার মা আমার মা-ই। আমার মায়ের সাথে কারো তুলনা করতে পারি না, করতে চাইও না। আমার মা আমাকে জন্ম দিয়েই ক্ষান্ত হননি। মুখে তুলে খাইয়ে দিয়ে আর হাঁটি হাঁটি পায়ে হাঁটতে শিখিয়েও শান্ত থাকেননি। আমাদের সাত ভাই-বোনের (অকালে এক বোনের মৃত্যুতে) প্রত্যেককে মানুষের মতো মানুষ হয়ে মানুষকে ভালোবাসতে শিখিয়েছেন। মা, মাটি ও ভাষাকে মর্যাদা দিতে শিখিয়েছেন।
মনে পড়ে বালকবেলায় আমাদের ইশকুলে পাঠাতে মায়ের কী আয়োজন। মা ফজরের নামাজ পড়ে আমরা ভাই-বোনদের নাস্তা করিয়ে পড়াতে বসতেন। তারপর গোসল করিয়ে সকালের খাবার খাইয়ে নিপুণ যত্নে ইশকুলগামী করতেন। দোয়া-কালাম পড়ে মাথায়, গায়ে ফুঁ দিয়ে বলতেন, “রাস্তার বাম পাশ দিয়ে যাস।” আজও ডান পাশের সমান্তরালে জীবনের জয়ন্তিকায় বাম পাশেই ছুটছি মাগো। তোমার দোয়া আর অফুরন্ত ভালোবাসায় ভর করে আমরা আট ভাই-বোনের প্রত্যেকেই আজ স্ব-স্ব অবস্থানে টিকে আছি স্বমহিমায়। এতে মায়ের অক্লান্ত শ্রম, ত্যাগ আর ভালোবাসা ভুলতে পারি না।
তবু মায়ের জঠরে থেকে তাকে যেমন কষ্ট দিয়েছি, আজও তার কষ্টের শেষ নেই, দুশ্চিন্তার অন্ত নেই আমাদের সুখ-দুঃখের ভাবনায়। পঞ্চাশ-ষাটটি বছর কাটিয়েছেন মা বুকের ওম দিয়ে সন্তানদের আগলে রেখে সংসারের ঘানি টেনে টেনে। রাজনীতিবিদ ও জনপ্রতিনিধি বাবা বরাবরই ব্যস্ত ছিলেন গণমানুষের সুখ-দুঃখে। সংসারের সকল চাওয়া-পাওয়া, দুঃখভার সবই বয়ে গেছে মায়ের ওপর। প্রত্যহ প্রত্যুষের আলোয় প্রাত্যহিকতা শুরু যার, মাঝরাতে আমাদের ঘুম পাড়িয়েই তবে মায়ের বিরাম বিছানায়।
বাবা নেই উনিশ বছর হলো। সে উনিশ বছর ধরে বাবার অভাব একটুও বুঝতে পারিনি মায়ের মায়ায়, সোহাগভরা শাসনের ছায়ায়। আমাদের সাত ভাই-বোনকে সংসারী করিয়েছেন। সন্তানদের সুখের চিন্তায় অস্থির হয়ে সংসার গোছাতে-সাজাতে ক্লান্ত সেই মা আজ দীর্ঘদিন অসুস্থ। সংসার আর বয়সের ভারে ভারাক্রান্ত মা এখন আর আগের মতো হাঁটাচলা করতে পারেন না। একটু কথা বললেই হাঁপিয়ে উঠেন। ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, শ্বাসকষ্টসহ শরীরের নানা জটিলতায় ভুগছেন।
মায়ের মমতা মা-ই শিখিয়েছেন। তাই তো মা আমার—পৃথিবী আমার। জননী আমার—ভালোবাসা আমার।
এ ঈদের প্রাক্কালে বিশ্বের সকল মায়ের প্রতি অফুরান শ্রদ্ধাঞ্জলি। ভালো থেকো মায়েরা। খুব ভালো। বেঁচে থাকো সন্তানদের চেয়ে বেশি সময়। আমার মায়ের জন্য হাত তুলে প্রার্থনা করো যেন সুস্থ হন দ্রুত।