কমলগঞ্জ (মৌলভীবাজার) প্রতিনিধি:
মহান মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য বীরত্বের জন্য বীরশ্রেষ্ঠ খেতাবে ভূষিত শহীদ সিপাহি হামিদুর রহমানের ৫৫তম শাহাদতবার্ষিকী আজ ২৮ অক্টোবর। ১৯৭১ সালের এই দিনে মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার ধলই সীমান্তে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সঙ্গে সম্মুখযুদ্ধে শহীদ হন তিনি। মাত্র ১৮ বছর বয়সে দেশের স্বাধীনতার জন্য জীবন উৎসর্গ করা এই বীর মুক্তিযোদ্ধা সাতজন বীরশ্রেষ্ঠর মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ।
শাহাদতবার্ষিকী উপলক্ষে বুধবার (২৮ অক্টোবর) সকাল ৯টার দিকে কমলগঞ্জের মাধবপুর ইউনিয়নের ধলই সীমান্তে বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের স্মৃতিস্তম্ভে পুষ্পস্তবক অর্পণের মাধ্যমে শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। কমলগঞ্জ উপজেলা প্রশাসন ও কমলগঞ্জ প্রেসক্লাবের পক্ষ থেকে পৃথকভাবে এ শ্রদ্ধা জানানো হয়। পরে তাঁর আত্মার মাগফিরাত কামনায় বিশেষ দোয়া ও মিলাদ মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন কমলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সন্দ্বীপ তালুকদার, বীর মুক্তিযোদ্ধা আরশাদ আলী, কমলগঞ্জ প্রেসক্লাবের সভাপতি আসহাবুজ্জামান শাওন, নির্বাহী সদস্য ও কমলগঞ্জ আবৃত্তি অঙ্গনের সভাপতি শাব্বির এলাহী, কমলগঞ্জ রিপোর্টার্স ইউনিটির সভাপতি কবি নির্মল এস পলাশ এবং বিজিবির ধলই বিওপির ইনচার্জ সুবেদার আক্কাস আলীসহ অনেকে।
শহীদ হামিদুর রহমান ১৯৫৩ সালের ২ ফেব্রুয়ারি ঝিনাইদহ জেলার মহেশপুর উপজেলার খোরদা খালিশপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবার নাম আক্কাস আলী মণ্ডল এবং মায়ের নাম কায়মুন্নেসা।
১৯৭১ সালের অক্টোবরের শেষদিকে ধলই সীমান্ত ফাঁড়ি দখলকে কেন্দ্র করে মুক্তিবাহিনী ও পাকিস্তানি সেনাদের মধ্যে তীব্র যুদ্ধ শুরু হয়। প্রথম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের ‘সি’ কোম্পানির হয়ে অভিযানে অংশ নেন হামিদুর রহমান। পাকিস্তানি বাহিনীর মেশিনগান পোস্টের বাধায় মুক্তিযোদ্ধাদের অগ্রযাত্রা ব্যাহত হলে সেটি অকার্যকর করার দায়িত্ব নেন তিনি।
পাহাড়ি খালের মধ্য দিয়ে বুকে হেঁটে এগিয়ে গিয়ে মেশিনগান পোস্ট লক্ষ্য করে দুটি গ্রেনেড নিক্ষেপ করেন হামিদুর রহমান। এ সময় গুলিবিদ্ধ হয়েও তিনি সাহসিকতার সঙ্গে শত্রুপক্ষের পোস্টটির কাছে পৌঁছে সেটি অকার্যকর করতে সক্ষম হন। তাঁর এই আত্মত্যাগে মুক্তিযোদ্ধাদের সামনে এগিয়ে যাওয়ার পথ তৈরি হয়। পরে মুক্তিযোদ্ধারা ধলই সীমান্ত ফাঁড়ি দখল করেন। তবে বিজয়ের মুহূর্তে হামিদুর রহমানকে আর জীবিত পাওয়া যায়নি।
প্রথমে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের হাতিমেরছড়া গ্রামে তাঁকে দাফন করা হয়। পরে ২০০৭ সালের ডিসেম্বরে তাঁর দেহাবশেষ বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনা হয়। ১১ ডিসেম্বর রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় ঢাকার মিরপুরের শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে তাঁকে পুনরায় দাফন করা হয়।
প্রতি বছর ২৮ অক্টোবর ধলই সীমান্তে অবস্থিত তাঁর স্মৃতিস্তম্ভে উপজেলা প্রশাসন, মুক্তিযোদ্ধা, বিজিবি, প্রেসক্লাবসহ বিভিন্ন সামাজিক ও পেশাজীবী সংগঠনের পক্ষ থেকে শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। দেশের স্বাধীনতার জন্য বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের আত্মত্যাগ নতুন প্রজন্মের কাছে সাহস, দেশপ্রেম ও আত্মনিবেদনের অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে রয়েছে।