অনলাইন ডেস্কঃ
মাত্র পাঁচ মাস আগে পৃথিবীর আলো দেখেছিল তার সন্তান। অথচ সেই সন্তানকে মায়ের স্নেহে বড় করে তোলার স্বপ্ন আর পূরণ হলো না। সিজারিয়ান অপারেশনের পর দীর্ঘদিন শারীরিক যন্ত্রণা ও নানা জটিলতার সঙ্গে লড়াই করে শেষ পর্যন্ত না ফেরার দেশে চলে গেলেন রাজবাড়ীর গোয়ালন্দের ডিপ্লোমা মিডওয়াইফ নার্স বিথী আক্তার (২৫)।
বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) সকাল সাড়ে ৮টার দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। বিথীর স্বামী রাকিবুল ইসলাম বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
বিথী গোয়ালন্দ উপজেলার উজানচর ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের তমিজ উদ্দিন মৃধার পাড়া এলাকার বাসিন্দা। তার মৃত্যুতে পরিবার, স্বজন ও স্থানীয়দের মধ্যে নেমে এসেছে শোকের ছায়া।
পরিবার সূত্রে জানা যায়, গত ৬ মে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে কন্যাসন্তানের জন্ম দেন বিথী। পরিবারের অভিযোগ, অস্ত্রোপচারের সময় তার পেটের ভেতর গজ রেখে সেলাই করে দেওয়া হয়। এরপর থেকেই শুরু হয় তীব্র শারীরিক যন্ত্রণা ও নানা জটিলতা।
শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে প্রথম অস্ত্রোপচারের প্রায় দুই মাস পর ১৫ জুলাই বিথীর আবারও বড় ধরনের অস্ত্রোপচার করা হয়। পরবর্তীতে অবস্থার আরও অবনতি হলে তাকে আইসিইউতেও চিকিৎসা দেওয়া হয়।
শেষ পর্যন্ত উন্নত চিকিৎসার আশায় গত ৪ অক্টোবর তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বৃহস্পতিবার সকালে মৃত্যুর কাছে হার মানেন ২৫ বছর বয়সী এই তরুণী।
বিথীর স্বামী রাকিবুল ইসলাম বলেন, “সকাল সাড়ে ৮টার দিকে ঢাকা মেডিকেলে আমার স্ত্রীর মৃত্যু হয়েছে। চিকিৎসকসহ সংশ্লিষ্টদের অবহেলার কারণেই তার মৃত্যু হয়েছে বলে আমরা মনে করছি। এ ঘটনায় আমরা মামলা করব।”
কথা বলতে গিয়ে সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়েও ভেঙে পড়েন রাকিবুল। তিনি বলেন, “আমাদের ছোট্ট শিশুটিকে এখন কীভাবে সামলাব, বুঝতে পারছি না। আর কোনো পরিবারের সঙ্গে যেন এমন ঘটনা না ঘটে, সেজন্য দায়ীদের সর্বোচ্চ শাস্তি চাই।”
পরিবারের সদস্যরা জানান, অস্ত্রোপচারের পর থেকেই শারীরিক অসুস্থতায় ভুগছিলেন বিথী। ফলে নিজের নবজাতক সন্তানকে ঠিকমতো কোলে তুলে নেওয়ার সুযোগও পাননি তিনি। মায়ের আদর-ভালোবাসা বোঝার আগেই শিশুটিকে হারাতে হলো তার মাকে।
গোয়ালন্দ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাইফুল হুদা বলেন, “বিথীর মৃত্যুর খবর শুনেছি। ঘটনাটি অত্যন্ত দুঃখজনক। কয়েকদিন আগে আমি নিজে বিথীর শিশুকে দেখতে গিয়েছিলাম। গতকাল জেলা প্রশাসকও শিশুটিকে দেখতে গেছেন।”
তিনি বলেন, ঘটনাটি তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন। তদন্তে কারও দায় পাওয়া গেলে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা উচিত। পাশাপাশি পরিবারটির সহযোগিতার প্রয়োজন হলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে তা করার চেষ্টা করা হবে।
বিথীর পরিবারের অভিযোগের বিষয়ে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বা সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি।
একদিকে মায়ের মৃত্যুর শোক, অন্যদিকে মাত্র পাঁচ মাসের শিশুর ভবিষ্যৎ,সব মিলিয়ে বিথীর পরিবার এখন এক গভীর অনিশ্চয়তার মধ্যে। তবে পরিবারের দাবি, এই মৃত্যুর প্রকৃত কারণ তদন্তের মাধ্যমে বেরিয়ে আসুক এবং দায়িত্বে অবহেলা প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হোক।